
অভ্যন্তরীণ রাজনীতি, জাতীয় স্বার্থ, সর্বোপরি ভূরাজনীতির নতুন সমীকরণ সামনে রেখে আপাতত ভারত সফরে যাচ্ছেন না প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পদস্থ কর্মকর্তা ও সংশ্লিষ্ট কূটনৈতিক সূত্রগুলো আমার দেশকে এ তথ্য জানিয়েছে।
সূত্রগুলো বলছে, নতুন প্রধানমন্ত্রীর জন্য দিল্লি সফর অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, স্পর্শকাতর ও চ্যালেঞ্জিং। পানিবণ্টনসহ যে ধরনের গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু ভারতের সঙ্গে রয়েছে, অন্য কোনো দেশের সঙ্গে বাংলাদেশের তা নেই। প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তারেক রহমান দায়িত্ব নেওয়ার পর দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের নতুন যাত্রা শুরুর যে ঘোষণা দিল্লির পক্ষ থেকে দেওয়া হয়েছিল, তা বাস্তবে রূপ দিতে কোনো পদক্ষেপই নেয়নি মোদি সরকার।
আগামী ডিসেম্বরে শেষ হচ্ছে বহুল আলোচিত গঙ্গা পানিবণ্টন চুক্তি। নতুন চুক্তি না হওয়া পর্যন্ত বর্তমান চুক্তিটি বহাল রাখতে ঢাকার অনুরোধে এখন পর্যন্ত সাড়া দেয়নি দিল্লি। সরকারপ্রধানের সফরের জন্য দুদেশের মধ্যে যে ধরনের আস্থার সম্পর্ক থাকা দরকার, এই মুহূর্তে সেটা একেবারেই অনুপস্থিত। প্রধানমন্ত্রীর চীন সফর নিয়ে দিল্লির বিরূপ মনোভাব প্রকাশের পাশাপাশি পুশইনের মাধ্যমে সীমান্তে উত্তেজনা তৈরি, প্রধানমন্ত্রীর একজন উপদেষ্টাকে দিল্লিতে বিমানবন্দরে হেনস্তা এবং সবশেষ মানবতাবিরোধী অপরাধে দণ্ডিত শেখ হাসিনাকে মাঠে নামিয়ে আবার বাংলাদেশকে অস্থিতিশীল করতে চাইছে দিল্লি। এমন পরিস্থিতিতে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের বহুল আলোচিত সম্ভাব্য দিল্লি সফরের যাবতীয় আলোচনা থেমে গেছে। চলতি বছরে প্রধানমন্ত্রীর দিল্লি সফরে যাওয়ার সম্ভাবনা একেবারেই ক্ষীণ বলে ঢাকা ও দিল্লির কূটনৈতিক সূত্রগুলো জানিয়েছে।
রাজনৈতিক ও আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা এই মুহূর্তে প্রধানমন্ত্রীর ভারত সফরে না যাওয়ার সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়ে বলেছেন, প্রধানমন্ত্রী সঠিক সিদ্ধান্তই নিয়েছেন। ভারত আসলে আওয়ামী লীগ ও শেখ হাসিনা ছাড়া বাংলাদেশের অন্য কাউকে বিশ্বাস করে না। তারেক রহমানের নেতৃত্বে বাংলাদেশের নতুন সরকার দায়িত্ব নিয়েছে ছয় মাসও হয়নি। এরই মধ্যে ভারত বাংলাদেশের অভ্যন্তরে অস্থিতিশীলতা সৃষ্টির মাধ্যমে সরকারকে চাপে রাখতে চাইছে। বিশ্লেষকরা বলছেন, ভারত যদি তাদের মনোভাব না বদলায় তাহলে তারেক রহমানের সরকারের উচিত হবে দিল্লির সঙ্গে দূরত্ব বজায় রেখে চলা। প্রধানমন্ত্রীর চীন সফরের মাধ্যমে ঢাকা-বেইজিং সম্পর্কের যে কৌশলগত ভিত্তি তৈরি হয়েছে, তা যেন কোনোভাবেই বাধাগ্রস্ত না হয়, সে ব্যাপারে সচেতন থাকতে হবে তারেক রহমানের সরকারকে।
দিল্লি সফরের বিষয়টি দূরে সরিয়ে রেখে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নিউ ইয়র্কে আসন্ন জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনে যোগদানের পাশাপাশি জাপান ও সৌদি আরব সফর নিয়ে প্রস্তুতির কথা জানিয়ে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা বলছেন, আগামী সেপ্টেম্বর মাসের শেষের দিকে জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনে যোগ দিতে নিউ ইয়র্ক যাবেন প্রধানমন্ত্রী। ওই সফরের প্রাথমিক প্রস্তুতিও ইতোমধ্যে শুরু হয়েছে।
এদিকে, প্রধানমন্ত্রী নিউ ইয়র্ক যাওয়ার আগে সম্ভাব্য জাপান ও সৌদি আরব সফর নিয়ে জোর আলোচনা শুরু হয়েছে। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা আমার দেশকে জানিয়েছেন, যত দ্রুত সম্ভব প্রধানমন্ত্রীকে টোকিও নিতে চায় জাপান সরকার। আগামী ১২ আগস্ট ঢাকায় বাংলাদেশ-জাপান পররাষ্ট্র সচিব পর্যায়ের বৈঠক অনুষ্ঠিত হবে। এতে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সম্ভাব্য জাপান সফরের বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা হওয়ার কথা রয়েছে।
এর আগে প্রধানমন্ত্রীকে সৌদি আরব সফরের আমন্ত্রণ জানিয়েছেন দেশটির যুবরাজ ও প্রধানমন্ত্রী মোহাম্মদ বিন সালমান। গত ৬ জুলাই ঢাকায় নিযুক্ত সৌদি রাষ্ট্রদূত ড. আবদুল্লাহ জাফর বিন আবিয়াহ তারেক রহমানের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে আনুষ্ঠানিকভাবে এ আমন্ত্রণের কথা জানান।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একজন সিনিয়র কূটনীতিক আমার দেশকে জানিয়েছেন, খুব শিগগির সৌদি পররাষ্ট্রমন্ত্রী প্রিন্স ফয়সাল বিন ফারহান ঢাকা সফরে আসতে পারেন। সৌদি পররাষ্ট্রমন্ত্রী যদি ঢাকা না আসেন তাহলে তিনি নিউ ইয়র্কে পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমানের সঙ্গে বৈঠকে বসবেন। পররাষ্ট্রমন্ত্রী আগামী সেপ্টেম্বরে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশন শুরুর আগে নিউ ইয়র্কে যাওয়া-আসার মধ্যেই থাকবেন। দুই পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সাক্ষাতে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সৌদি সফর নিয়ে চূড়ান্ত আলোচনা হবে।
Leave a Reply